মাটির মানুষ নেই মাটিতে, কী হবে ‘তাপদ্বীপ’ ঢাকার?
মাটির মানুষ নেই মাটিতে, কী হবে ‘তাপদ্বীপ’ ঢাকার?
মাটি ও মানুষের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। মাটি ছাড়া তো মানুষের টিকে থাকার কথা ভাবাই যায় না। কিন্তু যে মাটিতে দিগন্ত-বিস্তৃত সবুজ ফসলের ছড়াছড়ি থাকার কথা, সেখানে আকাশছোঁয়া ভবন। কোথাও এতটুকু খোলা জায়গা থাকলে তা কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দেয়া হচ্ছে। ‘মাটির মানুষের’ জীবন এখন পরিপূর্ণ যান্ত্রিক হয়ে গেছে। রাজধানী ঢাকার এ ভয়াবহ চিত্র দেখে উদ্বিগ্ন বিশিষ্টজনেরা।
অল আমেরিকান ইনভায়রনমেন্টাল ওয়েবসাইট বলছে, পৃথিবীর উপরিভাগের নরম আবরণই কেবল মাটি না। মাটি এমন একটা বাস্তুসংস্থান, যেখানে নানা জীবসত্তা রয়েছে। আছে বিভিন্ন খনিজ ও অর্গানিক উপদানও। আর পানি ও অক্সিজেনের মতো অমূল্য সম্পদও ধারণ করে মাটি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় মাটির ভূমিকা রয়েছে।
কত শতাংশ মাটি কংক্রিটে ঢাকা?
রাজধানীর ঢাকার ৮২ শতাংশের বেশি মাটি কংক্রিটে ঢাকা বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২০ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের কেন্দ্রীয় নগর এলাকার কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা ৮২ শতাংশ। আর জলাভূমির পরিমাণ মোট এলাকার চার দশমিক ৩৮ শতাংশ।
মাটি-মানুষে বিচ্ছিন্নতা
তিনি বলেন, ‘পর্যাপ্ত খেলার মাঠ থাকতে হবে। ঢাকামুখী মানুষের স্রোত কমাতে হবে।’
স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, ‘মানুষ মাটি-বিমুখ হয়ে যাচ্ছেন। আমাদের উন্নয়নের বয়ান ও ধারায় সবকিছুতেই পিচঢালা কাঠামোর কথা ভাবছি। স্কুলগুলোতে খেলার মাঠ নেই। সেগুলো গ্রাউন্ড হয়ে গেছে। মাঠগুলো পার্ক হয়ে গেছে। পার্কে তো মাটি রাখা হচ্ছে না। এতে মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।’
ঢাকা যেন ‘তাপদ্বীপ’
ঢাকা শহর এখন একটি তাপদ্বীপে পরিণত হয়েছে বলে জানান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন,
এই শহরে স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা। দিন দিন আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকা। গত কয়েক দিনের তীব্র তাপপ্রবাহ দেখলেই সেটা বোঝা যায়।
উন্মুক্ত জায়গার চেয়ে যেখানে একটা গাছ আছে, সেটা অনেক ভালো। আর কিংক্রিট বা বিটুমিনের স্থাপনা যেখানে বেশি থাকে, সেখানে উত্তাপ অনেক বেশি হয়। নগর বিজ্ঞানীরা এটিকে বলেন, আরবান হিট আইল্যান্ড (নগর তাপদ্বীপ)।
চল্লিশ শতাংশ জায়গা খোলা থাকলে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে সহজে চলে যেতে পারতো। আবার গাছপালা থাকলে তা তাপমাত্রা কমিয়ে আনতো। কিন্তু সেটা করা হয়নি।
শহরে দিনে ও রাতের তাপমাত্রার তারতম্য বেশি দেখা যাচ্ছে না। মাটি থাকলে তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়ে যেত। কিন্তু মাটি না থাকার কারণে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে। আগামীতে খালি জায়গায় উন্নয়ন করার সময় যতটুকু একান্তই দরকার, ততটুকু পাকা করতে হবে। বাকিটুকুতে মাটি রাখতে হবে।
মাটির মানুষের যান্ত্রিক জীবন
মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষ যান্ত্রিক জীবন যাপন করছে বলে জানান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ‘মানুষকে বলা হয় মাটির মানুষ। মাটি থেকেই মানুষকে তৈরি করা হয়েছে। এই কথাটার একটা গভীর তাৎপর্য আছে। কারণ মাটির সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে মানুষ মানবিক হবেন না।’
আরও পড়ুন: ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সিলগালা করতে রাজউককে চিঠি
এখন আর মানুষের স্কেলের সঙ্গে ভবনের স্কেল মিলে না। এ জন্য যারা টাওয়ারে বসবাস করেন, তাদের সঙ্গে সেই অর্থে মাটির কোনো সম্পর্ক থাকে না। তার কগনেটিভ বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।
কোন মন্তব্য নেই